প্রবন্ধ

বিশ্বায়ন ও অস্তিত্বের সংকট

বিশ্বায়ন ও অস্তিত্বের সংকট
ডঃ তনুশ্রী ঘোষ খণ্ড 1 · সংখ্যা 1 · JULY · 2025 · 29 বার দেখা

অস্তিত্ব সংকট কী?
‘An existence crisis is a moment at which an individua। questions the very foundations of their life. Whether this life has any meaning, purpose, or value. It is common।y tied with depression and /or purpose in life that is ‘0ne day I will be forgotten…what is the point of all my work.’
বিশ্বায়নের সার্বভৌম সমস্যা অস্তিত্ব সংকট, যা প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগেকার দিনে যখন মিডিয়া সরব ছিল না তখন মানুষ গ্রামে বসবাস করত এবং সেইটুকুতেই সন্তুষ্ট আত্ম নিয়োজিত ছিল। এখন মানুষ মিডিয়া অর্থাৎ টিভি, ইন্টারনেট ইত্যাদির দৌলতে বুঝতে শিখেছে পৃথিবীর কত বিস্তৃত এবং তার চাওয়া পাওয়ার জগতটা কত বড় হতে পারে। কি নেই এই জগতে? রকমারি ঐশ্বর্য, প্রাসাদ, সম্পদবিষয়ক, সোন্দর্য,ব্যক্তিত্ব, কৃতিত্ব, বিত্ত --- সে হতবাক হয়েছে এবং ভেবেছে তো সুন্দর জগতে এসে সে কিছুই করতে পারল না। তখন তার মধ্যে জাগছে নৈরাশ্য।
আগেকার দিনে মানুষ ছিল মানবতার সম্পন্ন নৈতিকতাসমৃদ্ধ তাই তাদের জীবনে যে উদাহরণ তারা তৈরি করে গেছেন তাতে দেখা যায় আত্মীয়তা পারম্পর্যইত্যাদি নিয়ে তারা ছিল গুণবাণ। যদি ভাতৃ বধূ বিধবা হতেন তবে তাকে 5/7 সন্তানসহ আশ্রয় দিতেন তাদের। যদি ভাই দুর্বল হয় তাকে টেনে তুলতো আর্থিক সফলতার দিকে সন্তানসহ মেয়ে লোক ছিল মাতৃময়ী শ্রী ময়ী। এখন নারীর যে উন্নতি ঘটছে সাথে ঘটেছে তাদের নৈতিক স্খলন। প্রথাগত শিক্ষা তাদের যথেষ্ট থাকলেও নীতি শিক্ষা ও মানবতা থেকে নারী যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছে। সমাজের ধমনীতে নারীর রক্ত বয়ে চলে, নারী নদীসম, সমাজ তাকে দেবীর প্রাধান্য দিয়েছে। কিন্তু নারী তার সেই পদমর্যাদা হারাতে বসেছে। তার পোশাক রুচি তার সম্পর্কবোধ, শ্রদ্ধাবোধ অনেক ক্ষেত্রে নিম্নগামী।
প্রথাগত শিক্ষা তাকে কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে? এই সমাজকে এতকিছু দেওয়ার পরও সে কি পেল অতীতে!! সে অপরের বাড়ির অধীন গৃহবধূ, সে অপরের বাধ্য স্ত্রী,পুত্রের মর্জির মাতৃত্ব, তার কর্ম ক্ষেত্রে তার সৃজন ময়ী ব্যক্তিত্ব তার পরিবার জীবনের পাচ্ পয়সার মূল্যে বিক্রি হয়না। তার কথার দাম নাই পারিবারিক জীবনে। গুটিকতক রাজনৈতিক নারী মাত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছাড়া আর কতটা নারীর কথার দাম এই সমাজে আছে? তারা যদি ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ার হন অথবা প্রফেসর হন তাদের পারিবারিক মূল্য কতটুকু? তাদের সম্পত্তির অধিকার কোথায়? যে পিতার ঔরসে তার জন্ম সেই পৈতৃক বাসস্থানের অধিকারী নয় সে? আইন তাকে অধিকার দিলেও পারিবারিক রাজনীতি তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। স্বামীর সম্পত্তিতে স্বামীর বর্তমানে তার কি অধিকার? বিয়ে হওয়ার পর থেকে নারী আসলে স্বাধীকার হারায় ও অপরের গৃহে দাসী হয়ে কাল কাটান। তিনি উদ্বাস্তু তাই স্বামী মদ খেয়ে তাকে উৎপীড়ন করলেও তিনি সন্ধাবেলা ঢাকাই জামদানি পরে বিয়ে বাড়ি যান। সমাজ তত্ব ঘাটাতে গেলে তার জীবন চলবেনা। কোন সাহসে তবে সমাজ নারীকে দেবী বলে? বিশ্বায়নের ফলে নারী অবস্থার প্রচুর উন্নতি ঘটলেও নারী নতুন পিতৃতন্ত্রের মধ্যে ঢুকে গেছে। এই বিশ্বায়ন নারীকে পণ্য বিপণন বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। নারীর নগ্নতাকে শিল্প বানিয়েছে। এখন নারীর নগ্নতাই হচ্ছে একটা বিরাট বড় ব্যবসা। নারী জীবনের আরেক করুণ চিত্র এখন উঠে এসেছে এই নতুন বিশ্বায়ন ও নতুন পিতৃতন্ত্রের কবলে যেখানে নারীর অবস্থা আগের থেকে আরো ভয়ানক। ফ্রাস্ট্রেশন তৈরি হচ্ছে এবং তার থেকে তৈরি হবে আরও গুরুতর অস্তিত্ব সংকট। চতুর্দিকে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা কিন্তু প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য কি তাই সকলের অজানা।
বিশ্বায়ন সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে আমাদের সাংস্কৃতিক জগত। হারাতে বসেছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এখনের প্রজন্ম নাটক যাত্রাপালা ক্লাসিকাল সঙ্গীত নৃত্য থেকে সরে যাচ্ছে। আজকাল কেউ আর পড়েননা বনফুল নজরুল যতীন্দ্রমোহন
Globalization is rapid।y transforming our world in profound and lasting ways…From new patterns of migration and diaspora, new trends in city and nation building and new techno-informational networks of কমিউনিকেশন and know।edge, the world is in rapid flux. And yet the need to identify and understand how globalization is effecting cultural change---"

বিশ্বায়ন আমাদের পঠন-পাঠনের আতিশয্য বৃদ্ধি করেছে, আত্মীয়তা প্রতিবেশী স্বজন অনুরাগের। বস্তুবাদী জগতের ধর্ম হয়ে উঠেছে এখন একটা মনোরঞ্জন এর বিষয়ে মাত্র। কারণ মানুষের ধর্মবোধ নৈতিকতা ও বিশ্বাসবোধ উবে গেছে। ধর্মের তত্ত্ব মূলধারা নিয়ে আমরা এখন আর মাথা ঘামাইনা। আমরা আজ নিজের যাপন ক্রিয়ায় ব্যস্ত নৈর্ব্যক্তিক আত্ম পরান্মুখ। এখন সমাজে বাঁচবার একমাত্র রণকৌশল আর্থিক সফলতা। মেধাকে ক্রয় করেছে অর্থ পরম্পরা। সুন্দর একটি মেসেজে উদ্ধৃতি দিচ্ছি---কথা গুলো এইরকম। আগের পিসিও ছিল সেখানে লোকের চাকরি করতো এখন পিসি ও উঠে গেছে। এতদিন মোবাইল রিচার্জের দোকান ছিল এখন তা অনলাইন হওয়ায় সে দোকানদারি শুধু মোবাইল রিপেয়ারিং এর কাজ করছে ১৯৯৮ সালে কোডাক কোম্পানিতে সতেরো হাজার লোক কাজ করতেন। আর ৮৫ শতাংশ ফটো পেপার দামি কোম্পানিটি তৈরি করত। এখন ডিজিটাল ফটোগ্রাফি হয়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির দেউলিয়া হয়ে গেছে আর সব চাকরিয়ানরা বেকার হয়ে গেছে। আগামীতে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে। যাবে বই পড়ার অভ্যাস কমে আসছে ই-বুক ই-জার্নাল ইত্যাদিতে ঝোঁক বেড়েছে তেমনি ব্লক তৈরি করে লিখে, ইউটিউবে ভিডিও, কার্টুন আপলোড করতে মানুষ এখন ব্যস্ত। ফলে নষ্ট হচ্ছে বইয়ের ব্যবসা প্রেস কালচার। কিছু সুবিধা অনলাইন হয়ে যাওয়ায় গাছের বীজ পর্যন্ত অনলাইনে আনা যায়। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আরেকটা ব্যবসা---- বাজারে বসে বীজ বিক্রয় করা বা কৃষকদের কাছ থেকে বীজ কেনা। অ্যামাজন স্ন্যাপডিল প্রভৃতির হাতে অনেকটাই ব্যবসা-বাণিজ্য চলে যাওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের। সবসময়ই মানুষ বেটার খুঁজে এই হচ্ছে মনুষ্য স্বভাব।
বিপণন যেমন মল মুখী বরাকের মত প্রত্যন্ত স্থানে যেখানে সহস্ত্র ব্যবসায়ী মাথায় হাত রাখছেন। কারণ বিভিন্ন মলের সস্তায় রকমারি জিনিসের সাথে পাল্লা দিতে পারছেন না তারা। কোটি কোটি টাকার মাল মলের আনাচে কানাচে পড়ে আছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এভাবে পুঁজি ইনভেস্ট করতে পারবেন কীভাবে? ফুটপাতের আনাচে-কানাচে দোকানদাররা বেকার হয়ে অন্য ব্যবসায় মন দিতে চাইছেন। যে অফারগুলি মানুষ মলে গেলে পায় তা বড় দোকানদাররাও দিতে পারেন না। আবার মল ব্যবসায় নিযুক্তি প্রাপ্ত ছেলেমেয়েরা এতদঞ্চলে পরিশ্রমের বিনিময়ে অল্প বেতন পান সমস্ত মুনাফা চলে যায় বড় বড় মল ব্যবসায়ীদের হাত। প্রাইভেট স্কুল-কলেজের সর্বত্র স্বল্প বেতনে তারা চাকরি করতে বাধ্য হন। অথচ সমস্ত মুনাফা চলে যায় স্কুল কলেজের মালিকের হাতে। এইতো টুকটুক বের হবার সাথে সাথে সমস্ত রিকশা আলারা বেকার হয়ে গেলেন তাদের দ্বিতীয় কোনো বিকল্প তৈরি হলো না এখনকার দিনে যেহেতু ভয়েজ টাইপ করাটা অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে তাই কম্পিউটারের যারা কম্পোজ করেন তাদের কাছে ক্রমশ ক্রেতা কমতে থাকবে। আমরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা দিতে পারছিনা মানুষের কাজ হাত থেকে অনবরত চলে যাচ্ছে। কাজ করার বিকল্প চলে আসছে মেশিন। বিশ্বায়ন সুযোগ-সুবিধা অঢেলতৈরি করে দিলেও সেই স্বপ্ন পূরণটা যে কতখানি মিথ্যা তা হারে হারে টের পাচ্ছি। আমরা না বিশ্বায়নের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছি, না আমাদের পূর্বতন মানবিক সম্পর্ক ফিরে যেতে পারছি। এই দুইয়ের মাঝখানে আমরা বোকোচ্ছপ মূর্তি ধারণ করেছি। এটাই আমাদের অস্তিত্ব সংকটের সবচেয়ে বড় ব্যাপার প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেকে ধরে রাখতে গেলে যে পর্যন্ত আমাদের মানসিক মেহনত করতে হচ্ছে তার থেকে সৃষ্টি হচ্ছে মনোবিকলন। শেষ পর্যন্ত আমরা কী পাব এখন সেটাই হচ্ছে বসে দেখবার বিষয়!!

29 বার দেখা 7 বার শেয়ার

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

লেখক: ডঃ তনুশ্রী ঘোষ
লেখকের পাতা দেখুন

সম্পর্কিত লেখা