প্রবন্ধ

শরৎচন্দ্র: পুনর্জিজ্ঞাসা

শরৎচন্দ্র: পুনর্জিজ্ঞাসা
তপোধীর ভট্টাচার্য খণ্ড 2 · সংখ্যা 1 · JULY · 2026 · 70 বার দেখা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যদি নিছক এই নামটি লিখি, যে কোনো শিক্ষিত বাংলাভাষী ভাববেন, সম্পূর্ণ হলো না। 'কথাশিল্পী' বিশেষণ যতক্ষণ যুক্ত না হচ্ছে, কেমন যেন বেমানান মনে হয়। অথচ এবছর তাঁর ১৫০ তম জন্মবার্ষিকী বিনা সমারোহে পার হয়ে গেল। ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৩৮ সালের ষোল জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাপ্ত জীবনে বাংলা কথাসাহিত্যকে তিনি যতটা দিয়েছেন, অন্তত বিশ শতকের অন্তিম দশক পর্যন্ত পাঠকের কৌতূহল যথেষ্ট পরিমাণে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। একুশ শতকের প্রারম্ভিক এক চতুর্থাংশ যখন পেরিয়ে যাচ্ছি, অন্তর্জালে মোহিত ক্ষণজীবী পাঠকেরা কি শরৎচন্দ্রকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে? তাদের মুশকিল আসান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে যে হারে নাড়া বাঁধছে নবীন প্রজন্ম, তাতে খুব কি ভরসা রাখা যায়? আর, যাঁরা তত পড়ুয়া নন এখন এবং নবীনতার দাবিও করতে পারেন না— তাঁদের কি শরৎচন্দ্র নিয়ে আদৌ মাথা ঘামাতে দেখি ইদানীং! যে দেশে বাঙালি হওয়াই অপরাধ সবরকম 'ঝামেলা' র ছোঁয়া বাঁচাতে ব্যগ্র জনপিণ্ড কেনই বা বাঙালিত্ব, বাঙালির পরম্পরা, বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিচলিত হবে? তারা ওপর মগজ-ধোলাইয়ের আয়োজন এখন নিরঙ্কুশ এবং স্বেচ্ছায় গিলোটিনে ঘাড় পেতে দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। কারণ, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান নীতির সূত্রধার যুগলের মনঃপূত হলে আখের সাজানো সহজ তাই শরৎচন্দ্রের দেড়শ বছর পূর্তি সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকাই সমীচীন।

এই কথাগুলি যে লিখলাম, তা কি কোনো ব্যাধির বিবরণ নাকি আত্মিক মড়কের সংকেত? বঙ্গীয় রেনেসাঁসের বর্ণচ্ছটা যখন পূর্ণ সুষমা নিয়ে উদ্ভাসিত, সৃজনী চৈতন্যের অভিব্যক্তি ছিল বহুমাত্রিক। শরৎচন্দ্রও সময়ের প্রকট ও প্রচ্ছন্ন দাবি মেটাতে কথাসাহিত্যের নিজস্ব আকল্প স্বচ্ছন্দে গড়ে তুলতে পেরেছেন কিন্তু রেনেসাঁসোত্তর এই উত্তরমানবতন্ত্রী পর্যায়ে বাংলাভাষী যখন বহুধা— আক্রান্ত, সময়বোধ ঘোর কালো সুলভপথে বিলীন। নিজেদের সাংস্কৃতিক চেতনা সংহত করে সত্যিই কি শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নতুনভাবে পড়তে পারি? পড়ার অভ্যস্ত ধরন আমরা এমনভাবে পালটে নিতে পারি যাতে সাম্প্রতিক অসময়ের চোরাবালি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়? এমন আরও কিন্তু প্রশ্ন পরপর দেখা দেয়। এমন নয় যে সমস্ত প্রশ্নের সমাধান শরৎচন্দ্রের কাছে চাইব। তা সমীচীনও নয়। তাহলে কেন এসব কথা উত্থাপন করছি। এইজন্যে করছি যে সময়শীলিত কবিলিখিয়েদের বার্তা আশ্চর্য গতি অর্জন করে সময়পাড়ি দিয়ে দূরবর্তী কালে নতুন তাৎপর্য নিয়ে পৌঁছে যায়। শরৎচন্দ্রের সমাজ, মূল্যবোধ পারিবারিক সম্পর্কের বিন্যাস, ব্যক্তিগত ও সামূহিক চাওয়া-পাওয়ারা প্রকরণ: কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। তবু জীবনাভূতি স্বভাবে এমন দ্বিরালাপিক যে লেখকের বয়ানে নিহিত অন্ত:স্বর সংবেদনশীল গ্রহীতার কাছে ঠিকই পৌঁছে যায়। আমরা যেমন তাৎপর্য সৃষ্টি করি, তেমনই তাৎপর্যও আমাদের রচনা সৃষ্টি করে চলেছে। চলমান ইতিহাসের সঙ্গে অপরিহার্য দ্বিবাচনিকতায় মূল্যবোধের অভিব্যক্তিও রূপান্তরপ্রবন মানুষের সঙ্গে অনবরত বদলে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে সম্পর্ক, সত্তার নান্দনিক ও দার্শনিক বৈধতা, উদ্যমের আকরণ ও বিন্যাস। এ আসলে নিরবচ্ছিন্নভাবে, তীব্রতর হয়ে ওঠা সংঘর্ষের বয়ান। স্বভাবত এই সংঘর্ষ বদলে দিচ্ছে উচ্চারণের অন্তর্বৃত্ত বিন্যাস এবং গ্রহীতারা অভ্যস্ত উচ্চারণের সঙ্গে তার দ্বিরালাপের বৈশিষ্ট্যও। আর, এই নিরিখেই শরৎচন্দ্রের আখ্যান বিশ্ব থেকে বুঝে নিতে পারি সামাজিক চিহ্নায়ন কিংবা তার স্বভাবের নিষ্কর্ষ। প্রবহমান বাঙালি জনগোষ্ঠীর সময়বাহিত সম্ভাবনার প্রকাশই খুঁজব তাই শরৎ সাহিত্যে।

আরও কিছু জরুরি কথাও বুঝে নেওয়া দরকার। শরৎচন্দ্র যখন একের পর এক উপন্যাস লিখে চলেছেন, সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র টানাপোড়েনের কথকতা যেন মায়াবী দর্পণ পাঠককে উপহার দিয়েছে। আর, সেই মায়ায় মুগ্ধজনেরা আকর্ষণীয় কাহিনি ও ইচ্ছাপূরণের আয়োজনে তৃপ্ত হয়ে উপন্যাসের শিল্পরূপ সম্পর্কে মৌলিক জিজ্ঞাসা মুলতুবি রেখেছেন। সেইসঙ্গে দ্রুত বিবর্তনশীল আধুনিকতার সংবিদ যেভাবে বিভিন্ন সাহিত্য মাধ্যমে ব্যক্ত হচ্ছিল, তার ধুপছায়া শরৎচন্দ্রের বয়ানগুলিতে কতটা দেখা গেছে কিংবা আদৌ দেখা যায়নি— সেই বিশ্লেষণ খুব জরুরি ছিল। কেননা সময়বোধ উপন্যাসের পাঠকৃতিতে যুগপৎ বাহিরে ও ভিতরে সক্রিয় অর্থাৎ প্রকরণে ও অন্তর্বস্তুতে আজকের পাঠক নিশ্চয় উনিশ শতকের শেষে বা বিশ শতকের শুরুতে ও মাঝামাঝি সক্রিয় পাঠকের রুচি ও অনুভব অনুযায়ী উপন্যাস বিচার করবেন না। এমন কী, বিশ শতকের ষাট-সত্তরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে ব্যাপক ভাঙনের সূত্রপাত-কালে পাঠকদের যে মনোভঙ্গি ছিল, শতকের অন্তিম দশকে আধুনিকোত্তর পর্বের পুঁজিবাদী সন্ত্রাস সূচনার পর্বে তা অনেকটা বদলে গেছে। আর, এখন, একুশ শতকের প্রারম্ভিক এক চতুর্থাংশ পেরিয়ে যেতে যেতে মাথার উপরে আকাশ ও পায়ের নিচে জমি কি খুঁজে পাচ্ছে সর্বতোভাবে আক্রান্ত এবং আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা? এসময় শরৎচন্দ্র কি কেবল দূর দিগন্তের ওপারে সফেন সমুদ্র হয়ে থাকবেন আমাদের কাছে? ঔপনিবেশিক বাংলায় প্রচ্ছন্ন সামাজিক ও আস্তিত্বি সংকট যদি ইঙ্গিতে পরিস্ফুট হয়ে থাকে, তাকে বিশদ করে তোলা কি দায় নয় আমাদের?

এটা অনস্বীকার্য যে শরৎচন্দ্রের আমলে প্রচলিত মাপকাঠি দিয়ে উপন্যাস নামক শিল্পমাধ্যমের মাপজোখ করা যাবে না এখন। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে যাঁর শেষ উপন্যাসগুলি রচিত হয়ে গেছে, প্রায় শতবর্ষ পরে আমরা এদের মধ্যে তাৎপর্যের কোন গোপন কুঠুরি খুঁজে নিতে পারি? ঔপন্যাসিকতা বা নভেলনেস নিয়ে যে ধারণা ক্রমান্বয়ে গড়ে তুলেছি, সেই নিরিখের কার্যকারিতা সম্পর্কে কি প্রতিপ্রশ্ন তুলে ধরব! এই সত্য কি অস্বীকার করা সম্ভব যে আধুনিকতাবাদের নানা পর্যায় এবং আধুনিকোত্তরবাদের গোলকধাঁধার সঙ্গে গাটছড়া বাঁধতে গিয়ে উপন্যাসের নন্দন ও প্রতিনন্দনের মধ্যে জলবিভাজনরেখা মনে রাখিনি। একটু একটু করে মুছে গেছে সংযোগ রচনার দায়। অসংযোগের কুহক এখন সর্বব্যাপ্ত। এমন সময় শরৎচন্দ্র-পাঠের নতুন প্রকরণ খুঁজে না নিলে তাৎপর্যের প্রকল্পও হারিয়ে যাবে। এই প্রত্যাহ্বানের মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি হতেই হবে আমাদের। নব্য বৌদ্ধিক বাস্তবে অস্তিত্ব-আকাঙ্ক্ষা-চেতনা খণ্ডিত, অস্থির ও অনিশ্চিত। নিটোল কাহিনি যখন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে, কাহিনির মায়াস্রষ্টা শরৎচন্দ্র কি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবেন সত্যিই? অর্থাৎ তিনি কি কেবলই ধূসর অতীতের কথক হিসেবে বিবেচ্য। ইদানীং আখ্যান বলতে আমরা বুঝি যুগপৎ কাহিনির নির্মাণ ও বির্ণিমান, ঘটনা- বিন্যাসের ক্রম অক্ষুণ্ণ রাখা আবার সেই ক্রমের রৈখিকতা ভেঙে দেওয়াও। এই বোধ অবশ্যই রাতারাতি জন্ম নেয়নি। প্রতিটি প্রসঙ্গতায় প্রেক্ষিতের সমর্থন, একথা মনে রেখেও প্রসঙ্গ এবং প্রেক্ষিতের অনন্বয় অনুশীলনযোগ্য। শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই অনন্বয় কতটা প্রকট, অভিনিবেশ দিয়ে তা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর উপন্যাসগুলিকে পরিবর্তনশীল সময়ের ছন্দ কতটা সম্পৃক্ত, তা এতদিন যেভাবে পরিমাপ করেছি— কতটা যুক্তিগ্রাহ্য এখন? প্রতিটি প্রজন্মের পড়ুয়ারা কি সত্যিই শরৎচন্দ্রকে পুনরাবিস্কার করতে চেয়েছেন। তাঁর কাহিনি কি নিছক কাহিনি? কুশীলবেরা কি শুধুমাত্র কাহিনির সূত্রে গাঁথা মানুষ-মানুষী? তাঁর দ্বারা উপস্থাপিত সামাজিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের ছবি ‘কি খণ্ডকালের’ সমস্যা হিসেবে গণ্য কেবল?

দুই

এই সবই পুনর্জিজ্ঞাসার আধেয়। এবং, সেইসঙ্গে আধারও। কাল নিরবধি আবার খণ্ডকালের অপস্রিয়মান ছায়া যে বিচিত্র কৌণিকতা তৈরি করে, তাও অনস্বীকার্য। সংবেদনশীল পাঠকের অন্তশ্চক্ষু যদি সক্রিয় থাকে, এই কৌণিকতার তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে ব্যক্ত সামাজিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের ছবি থেকে ভাঙ্গা মানুষ-মানুষীর নিজেদের মুদ্রাদোষে আলাদা হয়ে যাওয়াই কি লক্ষ করি? বিচিত্র জয়-পরাজয় স্খলন-প্রতিষ্ঠার উপস্থাপনায় সত্যিই কি অনুভব করি! 'স্বপ্ন নয়— শান্তি নয়— ভালোবাসা নয়, / হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়।' সেই বোধ কি আধুনিক সংবিদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? নাকি প্রাগাধুনিক চেতনাও আধুনিকতার অন্তর্বর্তী ছায়াঞ্চলে তা রুদ্ধ? এরপর যে প্রশ্ন অনিবার্য, তা হলো, ঔপনিবেশিক বাংলায় সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তনে রুদ্ধ সমাজের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপস্থাপনাকে আপাতভাবে উপনিবেশোত্তর কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের ফাঁদে স্বেচ্ছাবন্দী বাঙালি পড়ুয়ারা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন? আমরা তো ভুলতে পারি না যে প্রতীত বাস্তবতা বা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি দিনদিন সর্বগ্রাসী হয়ে পড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আশ্রয় নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও অবুদ্ধিজীবী পাঠকেরা ক্রমশ সত্যমিথ্যা সম্পর্কে নিজেদের অবস্থানই ঝাপসা করে তুলছেন। আধুনিকতাবাদের চক্রব্যুহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হতে-না-হতে আধুনিকোত্তরবাদী কৃষ্ণবিবরের প্রতি অপ্রতিরোধ্য ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে বাচনের পৃথিবী। 'উপন্যাস' 'ঔপন্যাসিকতা', 'আখ্যান', 'উপন্যাসায়ক' প্রভৃতি ভাববীজ থেকে চিরকাল যেভাবে অঙ্কুরিত হয়েছে কথনবিশ্বের শিল্পকৃতি, অস্থির অনিশ্চিত কেন্দ্রহীন সময়ে কীভাবে গ্রহণ করব বিগতকালের পাঠকৃতিদের?

আরেকটি জরুরি কথা মনে আসছে। যেহেতু বাঙালি লিখিয়ে এবং পড়ুয়াদের পাঠ-অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় রচিত বয়ানে সীমিত নয় এবং তাঁদের পরিগ্রহণে আন্তর্জাতিক আবহের শরিক হওয়া অনিবার্য, লিখন-প্রকল্প ও পাঠকৃতির তাৎপর্য-সন্ধান প্রক্রিয়ায় আখ্যানতত্ত্ব সহ মুহুর্মুহু নবায়মান সাহিত্য-ভাবনা ও সেই ভাবনায় সম্পৃক্ত দর্শন ইতিহাস-সমাজতন্ত্রের পরিশীলন আবশ্যিক। অর্থাৎ বৃন্তহীন পুষ্পসম আপনাতে আপনি বিকশিত হওয়া কিংবা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে কোনো কিছু রচনার ধারা এখন অচল। প্রকৃতপক্ষে একে শুধু এখনকার সত্য বলতে পারি না, প্রতিটি পর্যায়ে তা প্রাসঙ্গিক। শরৎচন্দ্র নিজেও যে সমকালীন ইউরোপের মনোবিজ্ঞান বিষয়ক বইপত্র বিশেষভাবে এবং কথাসাহিত্য সাধারণভাবে অনুসরণ করতেন, তার প্রমাণ আছে। উনিশ শতকের অন্তিম পর্যায়ে এবং বিশ শতকের সূচনা পর্বে ইউরোপের নবায়মান বৌদ্ধিক আবহ শরৎচন্দ্রের সৃজনী কল্পনাকে কতটা উস্‌কে দিয়েছিল— এ বিষয়ে আমাদের কৌতূহল স্বাভাবিক। সেইসঙ্গে একথাও মনে রাখব, টুর্গেনেভ-ডস্টয়েভস্কি-টলস্টয়-গোর্কি এবং বালজাক ভিক্টর উগো-চার্লস ডিকেন্স-মার্সেল প্রস্তু-ফ্রান্ৎস কাফকা-টমাস মান প্রমুখ যুগন্ধর কথাকারদের বিপুল অভিঘাত ঔপনিবেশিক বাংলার বৌদ্ধিক সমাজেও আলোড়ন তৈরি করেছিল। কুড়ির দশকের শেষদিক পর্যন্ত কয়েকটি তরঙ্গ শরৎচন্দ্রকেও স্পর্শ করেছিল। তবে কাহিনির মায়ায় প্রত্যয়ী লেখক বৃত্তান্ত-অতিযায়ী দ্যোতনার প্রতি খুব বেশি পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারেননি। তবে ১৯১৮ অবধি প্রকাশিত রচনাগুলিকে যদি শরৎ সাহিত্যের প্রথম পর্ব বলে শনাক্ত করি, গ্রন্থনাম সম্ভবত কিছু একটা সংকেত দেয়; বড়দিদি (১৯১৩), বিরাজ বৌ (১৯১৪), পরিণীতা (১৯১৪), পণ্ডিতমশাই (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), চন্দ্রনাথ (১৯১৬), বৈকুণ্ঠের উইল (১৯১৬), অরক্ষণীয়া (১৯১৬), নিষ্কৃতি (১৯১৭), শ্রীকান্ত ১ম পর্ব (১৯১৭), দেবদাস (১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), দত্তা (১৯১৮), শ্রীকান্ত ২য় পর্ব (১৯১৮)। যদিও ১৯১৮ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিবর্ষ, পরাধীন ভারতের বাসিন্দা কোনো লেখকের জন্যে তা কোনো সংকেত নয়। কিন্তু পাশাপাশি এও লক্ষ করতে ভুলি না যে গৃহদাহ প্রকাশিত হয়েছে ১৯২০ তে। এবং এতে অন্তত সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজের ধর্মতত্ত্বভিত্তিক নৈতিকতা-জাতিভেদ প্রথার অমানবিক নিষ্ঠুরতা এবং সতীত্ব আর নারীত্বের মিথ্যা আদর্শ প্রচারের কুপমণ্ডুকতা প্রধান উপজীব্য নয়। অবশ্য মৃণাল চরিত্রের উপস্থিতি প্রমাণ দেয় যে, শরৎচন্দ্রের পিছুটান সহজে যাওয়ার নয়। সেইসঙ্গে একই বছর বামুনের মেয়ে প্রকাশিত হওয়ায় মনে হয়, বইটি স্বভাবের নিরিখে আরও চার বছর আগে আত্মপ্রকাশ করতে পারত চন্দ্রনাথ ও অরক্ষণীয়ার যুগলবন্দি হিসেবে। মোটকথা, ১৯২০ থেকে ১৯৩৯ অবধি প্রকাশিত এই বইগুলি নিয়ে তাঁর দ্বিতীয়পর্ব ভাবা যেতে পারে; গৃহদাহ (১৯২০), বামুনের মেয়ে (১৯২০), দেনাপাওনা (১৯২৩) , নববিধান (১৯২৪), পথের দাবী (১৯২৬), শ্রীকান্ত ৩য় পর্ব (১৯২৭), শেষ প্রশ্ন (১৯৩১), শ্রীকান্ত ৪র্থ পর্ব (১৯৩৩), বিপ্রদাস (১৯৩৫), শুভদা (১৯৩৮) ও শেষের পরিচয় (১৯৩৯)। এবার নতুন সময়ের নতুন বাস্তব এবং তার নতুন চাহিদা ও নতুন জটিলতার কথা মনে রেখে অনুভব করি, আমরা সত্যিই পেরিয়ে এসেছি অন্তবিহীন পথ। শরৎচন্দ্রের দরদী মন ছিল, একে মান্যতা দিয়েও অস্বীকার করতে পারি না যে পরিবর্তন বিমুখ স্থবির সমাজের কূপমণ্ডূকতা প্রাগ্রসর কালের জীবনজিজ্ঞাসু জনের কাছে ‘জীবাশ্ম'- তুল্য অস্তিত্ব। একদা তা অনস্বীকার্য তথ্য ছিল এবং তখনও বৃহত্তর সত্যের পদবি দাবি করতে পারত না। আর, এখন সেইসব প্রকাণ্ড মিথ্যা আর অনাবশ্যক বল্মীকের স্তূপমাত্র। বরং কেউ কেউ এই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করতেও পারেন; কী ছিল লেখকের প্রকৃত অবস্থান? স্থিতাবস্থার প্রতি কখনও প্রকট এবং কখনও প্রচ্ছন্ন সমর্থন যদি ব্যক্ত করে থাকেন, তাহলে তাঁর 'আধুনিক' সংবিদ নিয়েই তো মৌলিক জিজ্ঞাসা দুর্নিবার হয়ে পড়ে। দুটি পর্বে তাঁর বইগুলি বিন্যস্ত করেছি যদিও, সত্যিই কি গুণগত স্পষ্ট স্বাতন্ত্র ধরা পড়েছে? নাকি বর্ণাশ্রম প্রথা যাবতীয় বিকার সহ সংক্রামিত হয়েছে কাহিনি-নির্মিতির বিভিন্ন স্তরে, কুশীলবদের আস্তিত্বিক প্রকল্পের কোষে কোষে এবং উপসংহারের দ্বিধাময় উপস্থাপনায়?

হ্যাঁ, মানবিক সম্পর্কের বিচিত্র আলো-ছায়া কিংবা উদয়-অস্ত অপ্রতিরোধ্য আবাগে ব্যক্ত হলেও বৃহত্তর জীবনকথা উপন্যাসায়িত হয়নি। সার্থক উপন্যাসের শিল্পকৃতিতে যেন দ্বিবাচনিকতাকে আমরা কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে শনাক্ত করে থাকি, শরৎচন্দ্রের অধিকাংশ রচনাতেই তার অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। বিবরণের মুন্সিয়ানায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে বিশ্লেষণের অভাব এবং হৃদয়ধর্মের উচ্ছাসে ডুবে গেছে অন্ধবিন্দুগুলি। সম্ভবত বলা যায়, 'তবুও মায়া রহিয়া গেল।' আর, আজকের মায়াশূন্য জগতে এখানেই শরৎচন্দ্রের জয় এবং পরাজয়— দুটোই সূচিত হয়। এটা ঠিক, গ্রামীণ সমাজের চিরাগত কুসংস্কার ও সীমাবদ্ধতা, যুক্তিহীন গোঁড়ামি ও অন্ধজনোচিত স্থবিরতার প্রতি তিনি তর্জনি সংকেত করেছেন। বিকারগ্রস্থ লোলুপ অত্যাচারীদের প্রতি ঘৃণার্বত্ত উদ্রেক করেছেন; তবু শেষপর্যন্ত গোপন দ্বিধায় নিয়ন্তা লেখক-স্বর যেন সন্তরপোনে নিরপেক্ষ অবস্থানটি অটুট রেখে দেয়। হয়তো বা সেইজন্যেই ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ অটুট রেখে যেসব সাধারণ বাঙালি পড়ুয়া স্ববিরোধীতায় কণ্টকিত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ছাঁচকে মান্যতা দিয়েছিল, তারাই শরৎচন্দ্রের রচনায় নিজেদের সমঝোতা প্রবণ ও আত্মখণ্ডনময় প্রবণতার প্রতি মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন খুঁজে পেয়েছিল। এদের মধ্য থেকেই উদ্ভূত হলো কাহিনির মায়া বিষয়ক সর্বজনীন ধারণা।

তিন

কিন্তু আমরা যারা অজস্র স্ববিরোধিতায় কণ্টকিত একুশ শতকে অবস্থান করছি, সেই ‘মায়া’র প্রতি কি প্রশ্নহীন সমর্থন জানাব? নাকি কিছু প্রতিপ্রশ্নও উত্থাপন করব? বিশ্বায়নেরসূত্রে যে উত্তরমানবতন্ত্রী পরিসর এখন সর্বগ্রাসী এবং প্রযুক্তির ত্বরিত বিকাশ আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে, কিসের সঙ্গে সমঝোতা করব এবং কোন স্থিতাবস্থা নিয়ে চিন্তা করব? শরৎচন্দ্রের আধুনিকতাও তো আজ সময়ের মহাফেজখানায় প্রত্নবস্তুর মতো বিরাজমান। কিন্তু চলিষ্ণু ইতিহাস এভাবে যত প্রত্যাভ্যান অনবরত তৈরি করছে, তা স্বাভাবিক। সমকালীন শিল্পকৃতি কীভাবে আগামীকালে পৌঁছায় এবং নতুন তাৎপর্যের ইশারা দেয়— জিজ্ঞাসুদের কাছে তা অনন্ত রহস্য-দ্যোতক। বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাস বা আখ্যান নিয়ে যাঁরাই ভেবেছেন, সেই রহস্যের সর্বজনমান্য সমাধান দিতে পারেননি। ডস্টয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ বা টলস্টয়ের ‘রিজারেকশন’ বলি কিংবা টমাস মানের 'দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন' বা মার্সেল পুস্তের রিমেমব্রেন্স অফ থিংস্ পাস্ট' কিংবা ফ্রানৎস কাফকার 'দ্য ক্যাসল' বা হোসে সারামোগর 'দ্য স্টোন ব্যাফট' বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের 'হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড’ বা কাজুও ইশিগুরোর 'দ্য বারিড জায়েন্ট' তো অপূর্ব কথাবস্তুর যোগান দিয়েও কাহিনি মাত্র সার হয়নি। বরং প্রতিটি পাঠকৃতি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ভাবে সীমাতিযায়ী অনেকান্তিক দ্যোতনা গর্ভ। আর, যে মায়ার কথা লিখেছি, প্রতিটি এই যেন তার ভাঁড়ার অফুরান। শরৎচন্দ্র সৃষ্ট মায়ার স্বভাব কিন্তু স্বতন্ত্র; তা কালাতীত নয় কালানুগ। বাঙালির অন্তশ্চেতনায় আশ্রিত পরম্পরা যখন বিঘ্নিত হচ্ছিল অসংযোগের অ-সামাজিক গোষ্ঠীপতিদের চরম ইতরতায়, বিপন্ন ব্যক্তিসত্তার জন্যে কথাশিল্পী কি মায়াসৃজনের বিশল্যকরণী যোগান দিচ্ছিলেন? হতে পারে সপ্রতিভ আধুনিকতার মোড়ক উপহার দেওয়ার কথা তিনি ভাবেননি (কেননা তার অনুভব তা বাঙালির জাতীয় স্বভাবজাত প্রবণতার পরিপন্থী) এবং এই বিবেচনায় তিনি সম্ভবত উত্তরপ্রজন্মের উত্তরায়ণ মনস্কতার প্রত্ন-নান্দীপাঠক। সেইজন্যে শরৎচন্দ্রের 'তত আধুনিক' না হওয়াটাই তাঁর শক্তি, দুর্বলতা নয়- যেমনটি ভেবে আমরা বহুদিন শ্লাঘা বোধ করেছি।

হতে পারে তিনি মার্কেজ বা সারামাগো বা ইশিগুরোর মতো সংকেতঋদ্ধ আখ্যান উপস্থাপন করেননি কিংবা ডস্টয়েভস্কি-টলস্টয়-মানের মতো সত্তার বহুস্বরিক দহনও উত্তরণের আশ্চর্য গাথা তৈরি করেননি অথবা প্রুস্ত ও কাফকার অদ্বিতীয় অস্তিত্ব খননের সঙ্গেও তাঁর কোনো তা তো বিবেচনার নিরিখ হতে পারে না, কীভাবে আমরা ভুলতে পারি যে তিনি উপনিবেশিক জনের প্রতিনিধি যাদের কোনো মুক্ত পরিসর নেই, সত্তার স্বাধীনতার প্রকল্প অসম্ভব এবং সেইজন্যে পাঠকৃতিতে ইচ্ছাপূরণের আয়োজনকে কি ভাবতে পারি ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। তাঁর 'তরুণের বিদ্রোহ' নিবন্ধের বিখ্যাত স্বীকারোক্তিকে তাই ভিন্নভাবে পড়া প্রয়োজন। 'কি পারিপারিক কি সামাজিক, কি ব্যক্তিবিশেষের জীবন সমস্যায় ‘আমি শুধু বেদনার বিবরণ, দুঃখের কাহিনি, অবিচারের মর্মান্তিক জ্বালার ইতিহাস, অভিজ্ঞতার পাতার উপরে কল্পনার কলম দিয়ে লিপিবদ্ধ করে গেছি— এইখানেই আমার সাহিত্য রচনায় সীমারেখা। ... সেইজন্যেই আমার লেখার মধ্যে সমস্যা আছে, সমাধান নেই, প্রশ্ন আছে, তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।' নিজের এই 'সাহিত্য রচনায় সীমারেখা' নির্দেশ করে শরৎচন্দ্র কেবল সমসাময়িক পাঠকদের বার্তা দেননি, উত্তরকালের পড়ুয়াদের জন্যেও সমাধানহীন সমস্যা এবং উত্তরশূন্য প্রশ্নের উপস্থাপনা করে কিছু জটিল কূটাভাসের আবর্তও তৈরি করেছেন। এই আবর্তের উৎস স্বয়ং শরৎচন্দ্রের দ্বিধা-আত্মসংশয়-সিদ্ধান্তহীনতা কিনা, আজকের পাঠক না ভেবে পারেন না। যাকে তিনি 'সীমারেখা' বলেছেন, তা আসলে মঞ্জুভাষণ। শ্রেণীচেতনার অনতিক্রম্য বাধ্যবাধকতা তার ভাবনাকে স্বাধীনতাকে প্রসারিত হতে দেয়নি। ‘অবিচারের মর্মান্তিক জ্বালা’ তিনি 'কল্পনার কলম দিয়ে লিপিবদ্ধ’ করলেও প্রাগুক্ত বাধ্যবাধকতায় অন্ধবিন্দু অটুট রয়ে গেছে। ফলে স্থবির সামাজিক পরিসরের 'Chronicle' রচিত হলেও উত্তরকালের পড়ুয়াদের উদ্ভোদিত করার মতো অন্তর্বয়নঋদ্ধ 'text' -এ সেইসব উত্তীর্ণ হয়নি। তাহলে জীবনাবসানের প্রায় পাঁচ দশক পরেও কীভাবে বাঙালি পড়ুয়াদের মধ্যে অক্ষুণ্ণ রইল শরৎচন্দ্রের আশ্চর্য জনপ্রিয়তা? রইল কারণ, মায়ার বিচ্ছুরণ সম্ভাব্য সবপ্রশ্নকে গৌণ করে দিয়েছে। চেনা পৃথিবী সামান্য অচেনাভাবে পরিবেশিত হওয়াকেই তাঁরা ‘সাহিত্য’ ভেবেছেন। ‘দুঃখের কাহিনি’ মর্মস্পর্শিতায় অভিভূত করছে, অবিচারের ইতিহাস ক্ষুব্ধ করেছে; এর বেশি কোনো চাহিদা উপন্যাসের কাছে তাঁরা পেশ করেননি। বহমান সময়ের স্বর এবং আধুনিক সংবিদ নিয়ে কোনো মৌলিক জিজ্ঞাসা উত্থাপন করাই যে ‘পড়া’ এবিষয়ে তাঁদের সচেতনতা ছিল না। তাই 'Chronicle' আর ' Text' এর স্বাতন্ত্র্যও স্পষ্ট হয়নি।

কথাগুলির তাৎপর্য স্পষ্টতর হতে পারে, যদি পণ্ডিতমশাই (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), চরিত্রহীন (১৯১৭), গৃহদাহ (১৯২০), দেনাপাওনা (১৯২৩), পথের দাবী (১৯২৬), শেষ প্রশ্ন (১৯৩১) ও বিপ্রদাস (১৯৩৫) নিবিড় পাঠের জন্যে বেছে নেই। এর মানে এই নয় যে চার পর্বে বিন্যস্ত 'শ্রীকান্ত' কে উপেক্ষা করছি। একেবারেই তা নয়। বরং ‘শ্রীকান্ত' এর উপস্থাপনাগত উচ্চার্বচতা আলাদাভাবে লক্ষণীয়। সামাজিক ইতিহাসের প্রতিবেদন হিসেবে বইগুলি গুরুত্বপূর্ণ 'Chronicle' নিশ্চয়ই। কিন্তু মানববিশ্বের বহুমাত্রিক উন্মোচন হিসেবে উপন্যাস কীভাবে ক্রমশ মুক্ত কথাকৃতি বা আখ্যান হওয়ার দিকে যাত্রা করেছে, সেই প্রেক্ষিতে শরৎচন্দ্রের প্রাগুক্ত রচনাগুলিকে কি সীমাতিযায়ী ও কালাতিগ ভাবতে পারি? একথা মানছি যে উনিশ শতক থেকে বিশ শতকে বহুবিধ ভাবদ্বন্দ্বে বিক্ষত বাঙালি সমাজের বিষমমাত্রিক বিবর্তনে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সঞ্চালক হিসেবে উদীয়মান ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভিঘাত নয়— বরং সামন্ততান্ত্রিক সমাজের জরাজীর্ণ অচলায়তনই অধিক সক্রিয়, এই বিচিত্র নেতিবাচক স্থিতি শরৎচন্দ্রের সংবেদনশীল মনে ধরা পড়েছিল। কিন্তু তা তো পাঠকৃতির অন্তঃস্বরে কিছুটা ইশারায় কিছুটা ব্যক্ত ভাবে আর কিছুটা বা এই দুইয়ের অন্তর্বর্তী ছায়াঞ্চলে প্রথিত হবে— এমনই প্রত্যাশিত। কাহিনির মায়া যতই সঞ্চারিত হোক কিংবা ইচ্ছাপূরণের আয়োজন লক্ষ্যভেদী হোক— বয়ান থেকে প্রতিটি প্রজন্মের পড়ুয়া প্রত্যুত্তর যোগ্যতা আহরণ করছে কিনা, এইটেই মূল প্রশ্ন। কেননা নইলে শরৎচন্দ্রকে পুনরাবিষ্কার করার আকাঙ্খা জাগবে না, সেই প্রক্রিয়া শুরুও হবে না। কাহিনি যদি নিছক কাহিনি এবং কুশীলবেরা শুধুমাত্র কাহিনির সূত্রে গাঁথা নরনারী থেকে যায়, সামাজিক দ্বন্দ্বসংঘাতের রক্তিম ছবিও নেহাত খণ্ডকালের সমস্যা হিসেবে সীমায়িত থাকবে।

একুশ শতকের বহুধাবিভ্রান্ত বাঙালি পাঠকেরা কোন আস্তিত্বিক প্রতীতির জন্যে শরৎচন্দ্রের প্রতি মনোযোগী হবেন— এই জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়া আবশ্যিক। এক একটি দার্শনিক সমাধান পাওয়া যায় জার্মান মনীষী হেগেলের কাছ থেকে; আমাদের সত্তার নির্বাস হলো আমরা কী ছিলাম। এক কালপর্ব থেকে অন্য কালপর্বে পাড়ি দিতে দিতে সত্তার অবস্থান যতই বদলে যাক, নির্বাস অটুট থেকে যায়। সেই অমোঘ নির্বাসের বার্তা বুঝে নেন কেবল চক্ষুষ্মান কবি লিখিয়ে শিল্পস্রষ্টারা। উদাসীন জীবনের পথিক শরৎচন্দ্র তার প্রতিকল্পসত্তা হিসেবে যে শ্রীকান্তকে এবং শ্রীকান্তের দ্বিরালাপিক অপর রাজলক্ষীকে নির্মাণ করেছেন, তাতে কি কেবল পাওয়া না পাওয়ার কাহিনি মাত্র লক্ষ করি? বা যথার্থ পাঠক খুঁজে নেন আস্তিত্বিক যুগলবন্দির নির্বাস। বুঝতে চান বাঁধতে বাঁধতে খোলা আর খুলতে খুলতে বাঁধার আশ্চর্য ধরণ। পথে নেমে ঘরের তাৎপর্য বুঝে নেওয়া আবার ঘরে ফিরে এসে পথের অন্তহীন চলিষ্ণুতার বার্তা বহন করা। তেমনি শ্রীকান্ত ও কমললতা মুক্তি ও বন্ধনের দ্বিবাচনিকতায় বিধৃত, মাটি ও আকাশ যেমন থাকে পরস্পরের সংলগ্ন অথচ সুদূর জীবনে বিস্ময়ের অন্ত নেই, এই চিরসত্য কি তথ্যের নর্মোকে রুদ্ধ হয়ে বুঝতে পারি? আবার শরৎচন্দ্র কখনও কখনও নর-নারীর মধ্যে মাটি ও আকাশের যুগলবন্দিকে বহুদূর অবধি বিস্তৃত করেও কী এক পিছুটানে সম্ভাবনাকে আকর্ষিত বা ঈষৎ কর্ষিত করে ক্ষান্ত হন। সে কি সমকালীন বাস্তবের কোনো অনতিক্রম্য বাধ্যবাধকতা? যেমন সতীশ ও সাবিত্রী, অজিত ও কমল, বৃন্দাবন ও কুসুম, জীবানন্দ ও অলকা, রমা ও রমেশ। সত্তাতাত্ত্বিক দ্বিরালাপ কি তবে আধিপত্যবাদী অচলায়তনের প্রচ্ছায়া থেকে নিষ্ক্রমনের পথ খুঁজে পায়না?

চার

শরৎচন্দ্র তাহলে কী বার্তা দিচ্ছেন আমাদের? বাঙালির সমাজেও বাচনের প্রেক্ষিত অনৈতিক্রম্য সামাজিকতার সর্বত্র বিধৃত। স্থিতিশীলতার পক্ষপাতীজনেরা যতই রৈখিকতা আরোপ করুক, সময় তা বিনির্মাণ করবেই। তার অভিখচিত দৃশ্য ও অদৃশ্য আয়তনের সংঘর্ষ থেকে অনবরত জেগে ওঠে নতুন সম্ভাবনাময় উচ্চারণ। যে কথকতা উপলব্ধি করেন, সৃজনের নন্দন তাঁর কাছেই ধরা দেয়। কিন্তু সামাজিকতার বোধ মানে কি বহুশতাব্দি বাহিত ধর্মতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত ন্যায় ও অন্যায়বোধের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ? ঠিক, শরৎচন্দ্র ‘বামুনের মেয়ে’, ‘অরক্ষণীয়া’, ‘নিষ্কৃতি’, ‘চন্দ্রনাথ’, 'বিরাজবৌ’, ‘নববিধান’, ‘শুভদা’ লিখেছেন। এবং নারীর মূল্য রচয়িতা শরৎচন্দ্র অধঃপতিত বা নির্যাতিতা মেয়েদের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে এনেছেন রক্ষণশীলতার অচলায়তনে ( অভয়া ও কমল ব্যতিক্রম মাত্র)। এইজন্যেই কি দশকের পর দশক ধরে সমস্ত স্তরের পড়ুয়াদের কাছে শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা অপ্রতিরোধ্য থেকেছে। মনে করুন ‘পল্লীসমাজ’ এর রমার কাশী যাত্রার আগে রমেশের সঙ্গে কথাবার্তা। ২০২৫ সালে যিনি পড়ছেন, তাঁর কাছে কাশী যাত্রা মানে কি অগস্ত্য-যাত্রা নয়? কিংবা ‘দেবদাস’ এর পার্বতীর কথা! অথবা ‘নববিধান’ এর নিঃসম্পর্কের চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়া সম্পর্কের উপস্থাপনা। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো ‘গৃহদাহ’- এর মৃণাল, বিশেষত উপসংহারে অচলার প্রতি তার উক্তি। ‘বিপ্রদাস’ এর বন্দনায় কি যৌক্তিক স্বাভাবিকতা পাই? কেন এমন হয়? দ্রোহাত্মক চিন্তার স্ফুলিঙ্গ স্বয়ং শরৎচন্দ্র সাড়ম্বরে নিভিয়ে দেন কেন?

সার্থক উপন্যাসে আমরা তো প্রত্যাশা করি, সত্তা ও অপরতার সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন সোচ্চারও নিরুচ্চারের অন্তর্বয়ন ব্যক্ত হবে। এই অন্তর্বয়নস্বর ও প্রতিস্বরের সমারোহে সৃষ্ট হয় লক্ষ্যভেদী সমস্ত পাঠকৃতিতে। শরৎচন্দ্রের বয়ানে প্রতিস্বরকে কতটা পরিসর দেওয়া হয়েছে? স্বয়ং লেখকই কি বাদ সেধেছেন? অথচ বাঙালি সমাজের বিভিন্ন অবতল থেকে গৃহীত অস্তিত্বের পরস্পর-ভিন্ন আয়তনের সমান্তরাল উপস্থিতির মধ্যে পুনর্গঠিত হয় জীবনের অভিজ্ঞান। তাই কোনো শিল্পত উচ্চারণই বিচ্ছিন্ন একক নয়। সত্তার গভীরে একক বাচন ও সামূহিক বাচনের সঞ্চরমান পরিসর থেকেই জেগে ওঠে আখ্যান-নিয়ামক উচ্চারণের নিজস্ব নন্দন ভার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিষ্কর্ষ। উপন্যাসের পাঠকৃতির গভীরে অবগাহন করতে জানেন, তাঁদের কাছে তেমন উচ্চারণ যেন 'password'। যদি তা অধিগত থাকে, তাহলে তাৎপর্যের রত্নগুহা ‘খোল যা সিমসিম’ এর জাদুতে ওপার ঐশ্বর্য উন্মুক্ত করে দেবে। উচ্চারণের অনন্যতা শিল্পকৃতির সার্থকতার অভিজ্ঞান। শরৎ-সাহিত্য উনিশ ও বিশ শতকের আততিকে আত্তিকৃত করার প্রক্রিয়ায় সেই অনন্যতার নিদর্শন উপস্থাপিত করেছে কিনা, এইটেই প্রধান বিবেচ্য। জীবন অন্তরীকৃত হলো কিনা কাহিনি ও কুশীলবদের নির্মাণে-বিনির্মাণে— তা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। জীবন বহির্বৃত ঘটনা সন্নিবেশে উত্থান পতনের আকর মাত্র নয়; তা বাইরে থেকে উচ্চারণের উদ্ভব ও বিকাশকে প্রভাবিত করে না। অস্তিত্বের গহনে অন্তর্ভেদী আলো নিক্ষেপ করে সেখানেই সন্ধান করে চিহ্নায়নের উৎস। সত্তা ও অপরতা সম্পর্কে সামাজিক মূল্যায়নের প্রেরণাও তাতে সূক্ষ্মভাবে সম্পৃক্ত থাকে। নন্দন মূলত সামাজিক সংবেদনারই বিশিষ্ট অভিব্যক্তি। তাই শিল্পসাহিত্য উচ্চারণের তত্ত্ব মূলত সৃষ্টির সমাজতত্ত্ব। সংযোগের মধ্যেই সৃষ্টির সার্থকতা আর উচ্চারণ অনবরত রূপান্তরিত হয় সংযোগের সামাজিক প্রেক্ষিত অনুযায়ী। লেখা ভালো, সামাজিক প্রেক্ষিতের অন্তর্বৃত্ত আততিকে ইতিবাচক উত্তরায়নের পথ নির্দেশ করেই কোনো লেখক সংযোগ কুশল হতে পারেন। শরৎচন্দ্রের পাঠকৃতিগুলি যদি এই সংযোগের প্রস্তাবনা করে থাকে, একুশ শতকের আমূল রূপান্তরিত পাঠক ও সেই প্রস্তাবনার মধ্যে দ্বিরালাপের সূত্র সন্ধান করতে উৎসাহী হবেন। নয়তো কাহিনির উপজীব্য সমাজ এবং তার সংকট প্রতিভাত হবে নিতান্ত ধূসর ও ভস্মীভূত অতীতের প্রত্নবস্ত হবে। আর কুশীলবদের সাফল্য ব্যর্থতা নিরর্থক কিছু বুদ্বুদের সমারোই মাত্র।

এইটে মনে রেখে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের সম্পূর্ণ নতুন পুনঃপাঠ ও পুনর্বিবেচনা প্রস্তাব করছি। ‘গৃহদাহ’ বা ‘শেষ প্রশ্ন’ এর নামকরণের সার্থকতা বিপর্কেন্দ্রিক পাঠ এখন অবান্তর। শ্রীকান্ত ভ্রমণকাহিনি বা উপন্যাস— এই নিয়ে বিতর্ক এর নৈতিকতা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তেমনই চরিত্রহীন বা পথের দাবি র বৈপ্লবিক রাজনীতির সারবত্তা নিয়ে পর্যালোচনা সমানই নিষ্ফল। কেননা দ্বিরালাপ-খচিত উপন্যাসের কথাকৃতিতে এধরনের অন্তঃসারশূন্য ও পুনরাবৃত্তিময় বিদ্যায়তনিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো উদ্‌ভাসনী আলো নিক্ষেপ করতে পারে না। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে, শরৎচন্দ্রকে চিরাগত ভাবনার পিঞ্জর থেকে মুক্ত করব নাকি গড্ডলিকা প্রবাহে মিশে থাকব! কথাকার মাত্রেই সন্ধানী; ঔপনিবেশিক আবহের অজস্র সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শরৎচন্দ্র নিজের খোঁজ বজায় রেখেছেন। তাঁর 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের চারটি পর্বের কথাই ধরি কিংবা 'দেনাপাওনা' বা 'পল্লীসমাজ' এর বিশেষ আবহ— সর্বত্র বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মিথষ্ক্রিয়া কিংবা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিটি উচ্চারণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রতিটি বয়ানে কোনো একজন কুশীলব বিশেষ কোনো মুহূর্তে শুধুমাত্র নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও একক উপলব্ধি নিঙ্‌ড়ে নিয়ে বক্তব্য পেশ করেন না। শ্রীকান্ত স্বয়ং এবং রাজলক্ষ্মী ও কমললতা কিংবা নাহর, সুনন্দা, বজ্রানন্দ, অভয়া ও রোহিনী; কেউই ব্যতিক্রম নয়। তেমনই জীবানন্দ ও অলকা নির্মল ও ফকির অথবা রমেশ ও রমা, বিশ্বেশ্বরী: প্রত্যেকেই জটিল ও গতিময় সামাজিক প্রকরণের অংশীদার। কেউ থাকে আলোয়, কেউ ধুপছায়ায়, কেউ বা নিরন্ধ্র অন্ধকারে; তবু প্রত্যেকেই মূলত সামাজিক অন্বয় বা অনন্বয়ের সূত্রধার। এরা পাঠকের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছে তা অবশ্যই কথাকারের শিল্পভাষা নির্মাণের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। তবে শিল্পভাষা বিশ্লেষণের যে বিপুল পরিসর প্রয়োজন, আপাতত তা ব্যবহার করতে পারছি না।

শরৎচন্দ্রের এই উত্তরপাঠে মনে রাখছি যে শিল্পমাধ্যম হিসেবে উপন্যাস ইদানীং আন্তর্জাতিক আবহের কথা মনে করিয়ে দেয়। কারণ, বিশ্বায়ন এখন জীবনযাপনের অনস্বীকার্য অনুষঙ্গ হয়ে আমাদের ভাবনা প্রকরণকে দিক নির্দেশ করে। অন্যদিকে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তব সম্পর্কে সচেতন থাকতেই হয়। কোন্ সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি শরৎচন্দ্রের বিশ্ববীক্ষার নিয়ামক এবং কোন ঔপনিবেশিক আধুনিকতা যুগপৎ অন্তর্বৃত ও বহির্বৃত হয়ে তাঁর অস্তিত্বে ছায়াতপ ছড়িয়ে দিয়েছে— তা তো মনে রাখতেই হয়। তাঁর যেসব পাঠকৃতি ও কুশীলবদের প্রতিচকিত দৃষ্টিপাত করেছি, তাদের মধ্যে একক ও সামূহিক বাচনের দ্বিবাচনিকতা কিংবা তার অভাব বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে পারি, কাহিনি নির্মোক মাত্র। কীভাবে বস্তুবিশ্ব চিহ্নবিশ্বে রূপান্তরিত হলো কিংবা সেই রূপান্তর কেন ঘটলো না— তাতে ভাবাদর্শের প্রবর্তনা কতদূর, সাম্প্রতিক পাঠক তা লক্ষ করতে চান। অবশ্য এতেও সমস্যা রয়েছে। শরৎচন্দ্রের ভাবাদর্শগত অবস্থান সর্বত্র স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সময় নির্বন্ধে বা চিঠিপত্রে তিনি যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তা অনেকটা তাৎক্ষণিক। তাঁর পাঠকৃতিতে যা পরিস্ফুট হয়েছে— আখ্যানের গ্রন্থনায় এবং কুশীলবদের সংলাপে সেইসব উপস্থাপিত পরিস্থিতির দাবি মিটিয়েছে নাকি স্বয়ং লেখকের বিশ্বাস প্রতিফলিত করছে: তা ভেবে দেখতে হয় নিশ্চয়। সবটাই জীবনের নির্মীয়মান প্রকল্প সম্পর্কে সত্তার প্রত্যুত্তর যোগ্যতার নিদর্শন নয়। শরৎচন্দ্র রয়েছেন দেবদাসের মর্মচ্ছেদী আত্মবিনাশে, রয়েছেন পার্বতীর প্রতিকারহীন যন্ত্রণায়, রয়েছেন চন্দ্রমুখীর চিরস্থায়ী অপর পরিসরে। কিন্তু এই নিরিখে তাঁর নান্দনিক ও সামাজিক ভাবাদর্শ নির্ণয় করা সঙ্গত নয়। তেমনই চরিত্রহীন বা পথের দাবী বা শেষপ্রশ্ন এর মতো পরস্পর ভিন্ন পাঠকৃতিত্তেও লেখককে ভাবাদর্শগত অবস্থান এবং প্রত্যুত্তরযোগ্যতার স্বভাব ও অন্বিষ্ট সম্পর্কে বিচিত্র সব জিজ্ঞাসা উত্থাপিত হতে পারে।

পাঁচ

শরৎচন্দ্র সম্পর্কিত প্রস্তাবিত পুনর্জিজ্ঞাসা এইজন্যেই হয়ে ওঠে তাৎপর্যবহ। উপন্যাস পড়ার চিরাভ্যস্ত প্রকরণ থেকে সরে দাঁড়ানো তাই আবশ্যিক। উপন্যাসশিল্প পরিবর্তনশীল সময়ের ছন্দে সম্পৃক্ত হয়ে সংকটদীর্ণ জীবন থেকে কীভাবে বাখতিন কথিত প্রত্যুত্তরযোগ্যতা আহরণ করেছে, নিবিষ্টভাবে তাই বিশ্লেষণ করা দরকার। নতুন প্রজন্মের পড়ুয়ারা এভাবেই ভিন্ন ধরনে শরৎচন্দ্রকে আবিষ্কার করুন। জীবন সত্যের অন্তঃসারে পৌঁছানোর জন্যে তাঁর প্রতিবেদনগুলিকে চিহ্নায়িত সোপান হিসেবে গ্রহণ করা যায় কিনা, সেইটে গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর যেসব উপন্যাস এখনও পাঠকদের মধ্যে অপ্রতিরোধ্য, আধুনিক সংবিদ বা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কিত প্রতিপ্রশ্ন কেন তাদের সামনে নুয়ে পড়ে— এই বিষয়টিও ভেবে দেখতে হয়। কিন্তু উপন্যাসের মতো আন্তর্জাতিক শিল্পমাধ্যম তো শুধুমাত্র মায়াবী দর্পণমাত্র নয়, তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তবে নিজস্ব চেতনায় মগ্ন কৃষক শরৎচন্দ্র যে সৃষ্টি শস্য গোলায় তুলছেন, তা উপন্যাস-ভুবনে কার কৃতিত্বের সঙ্গে একই বর্গভুক্ত, এই আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক সমাজের দ্বারা আরোপিত প্রতিবন্ধক উপেক্ষা করে তিনি যে সৃজনের আলো জ্বালিয়ে নিয়েছিলেন, এই তথ্যের সামাজিক নন্দনগত মূল্য অনেকখানি। তিনি তো ইতিহাসের নিয়ামক সময়ের মাধ্যাকর্ষণ, এড়াতে পারেননি; কেউই তা পারেনি। তবু ‘চরিত্রহীন’, ‘পথের দাবী’, ‘শেষপ্রশ্ন’, এর মতো পাঠকৃতিতে কী এক অস্ফুট প্রবণতার সংকেত যেন ব্যক্ত হয়েছে। বিকাশমান নাগরিক জীবনের ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা, চিরাগত সম্পর্ক-বিন্যাসের প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক আবরণের ভাঙন ইত্যাদি শরৎচন্দ্রের সম্পূর্ণ অভিনিবেশ পায়নি। তবু এও অনুভব করি, তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন এই অর্ধস্ফুট উচ্চারণ:

‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?

তারি রথ নিত্যই উধাও

জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়-স্পন্দন

চক্রেপিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।’

কিন্তু ‘চক্রপিষ্ট আঁধারের’ অস্ফুট অনুভব আখ্যানের শিল্পভাষায় রূপান্তরিত হয়নি। পরস্পর ভিন্ন পরিসরে সাবিত্রী, কিরণময়ী, অভয়া, কমললতা, চন্দ্রমুখী, কমল পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো ডানা ঝাপটালেও ঈপ্সিত আকাশে পৌঁছানোর সামর্থ্য তাদের ছিল না। শরৎচন্দ্রের দুর্নিবার পিছুটান তাদের সেই স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিসর যোগান দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেনি। অন্তত বাংলার স্বাভাবিক সামাজিক ভূগোলে তাদের ঠাঁই হয়নি।

ঠিক, ৫৭ তম জন্মদিনের অভিভাষণে শরৎচন্দ্রের সেই বহুচর্চিত উক্তি এখানেও উল্লেখ করতে পারি: ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলেনা কিছু.... এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে। এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।’ কিন্তু উপন্যাসের শিল্পকৃত্তি কি এই বিন্দুতেই থেমে যাবে? তার সামাজিক দৃষ্টি পালন করেও উত্তরকালের জন্যে কিছু সীমতির্যায়ী সংকেতও তো দিয়ে যাওয়া দরকার। যেহেতু আজকের পাঠকের প্রেক্ষিত বিশ্বায়িত, স্বতশ্চভাবে বাংলা ভাষার কথাকার ভুবনপটে সম্পৃক্ত হয়ে যান এবং প্রত্যাশাও সেই অনুযায়ী তৈরি হয়ে যায়। অযৌক্তিক প্রতিতুলনা না করেও বুঝে নিতে চাই, সামাজিক ও আস্তিত্বিক প্রকল্প সৃষ্টিশীল কথাকারদের দ্বারা কত বিচিত্রভাবে নির্মিত হতে পারে। এ কেবল কাহিনির অভিনবত্ব বিচার নয়; কেননা নির্মিতির দিক দিয়ে কেউ এগিয়ে বা কেউ পিছিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কোন সৃষ্টিই পুরোপুরি মূল্যহীন হয় না। অবশ্য সামাজিক ও নান্দনিক দায়বোধের অভিব্যক্তি থাকবেই। শরৎচন্দ্রের দায়বোধ কত গভীর তা উপলব্ধির জন্য প্রচলিত ব্যাখ্যার থেকে বাইরে যেতে হয়। নইলে পাঠকৃতির আপাত সাময়িক কথাবস্তুও কীভাবে উত্তর প্রজন্মের পাঠকের পক্ষে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, সেই রহস্য স্পষ্ট হয় না।

মূল্যনিরপেক্ষ জীবনযাপন করা কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। স্রষ্টা লেখক এবং গ্রহীতা পাঠক-প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কথাটি অনস্বীকার্য। অভিঘাতময় ইতিহাসকে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না, অস্বীকার করতে পারেনা, বিশেষ সময় ও পরিসরের অন্তর্বয়নকে। প্রশ্ন তৈরি করতে করতে আর সম্ভাব্য মীমাংসা খুঁজতে খুঁজতে পার হয়ে যায় জীবন। শরৎচন্দ্র ‘শেষপ্রশ্ন’ এর বয়ানে যত জীবন সম্পর্ক ঈপ্সিত লক্ষ্য বিষয়ে জিজ্ঞাসার আবর্ত গড়ে তুলেছেন, সেইসব কি আরও বেশি মাত্রায় প্রতিপ্রশ্নের কুহক গড়ে তোলেনি? ‘পথের দাবী’তে শ্রেয় ও প্রেমের ব্যক্ত ও অব্যক্ত দ্বন্দ্ব পথ-পাথেয়-গন্তব্য সম্পর্কে যত আঁধি তৈরি করেছে, সমানুপাতিক কোন সমাধান দিয়েছে কি সত্যিই! এরকম আরো জিজ্ঞাসা নির্মাণ করতে পারি ‘চরিত্রহীন’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘বিপ্রদাস’ নিয়েও। আর লক্ষ করতে পারি কত অভাবিত ভাবে বদলে যায় সমস্ত গ্রন্থনা ও অনুষঙ্গের তাৎপর্য। শরৎচন্দ্র যত উপকেন্দ্রিক, খামখেয়ালি, উড়নচণ্ডি জীবন যাপন করে থাকুন, তিনি কংগ্রেস দলের জাতীয়তাবাদী কার্যসূচিরও শরিক হয়েছিলেন। হয়তো তাঁর সৃজনী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তা আপাততভাবে নিঃসম্পর্কিত। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ধুঁকতে থাকা সমাজের গতিহীনতার সমান্তরালভাবে রাজনৈতিক মুক্তি আকাঙ্খার অনিবার্য অপূর্ণতা ও ব্যর্থতার ভবিতব্য নিয়েও কি তাঁর মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি? ‘পথের দাবী’- র সব্যসাচী হয়তো ইচ্ছাপূরণের প্রতীক। কিন্তু অবনত পশ্চাৎপট হিসেবে বিরাজমান ধর্মতন্ত্র ও বর্ণাশ্রম প্রথা শাসিত অষ্টাবক্র সমাজের দুর্মর বাস্তব তাঁকে কতটা ভাবিয়েছে, এর দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত তাঁর রচিত অজস্র উপন্যাসের এক বাচনিক স্থবির জগৎ। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আস্তিত্বিক অনন্যতা কীভাবে খুঁজে নিতেন, কীভাবেই বা গড়ে উঠত সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরযোগ্যতা। এক প্রশ্ন থেকে জন্ম নেয় আরও অনেক প্রশ্ন। সাম্প্রতিক পুনর্জিজ্ঞাসায় এইসব কিছুর মোকাবিলায় তৈরি থাকতে হয় আমাদের।

একথাও তো ভাবতে হয়, শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষতম জন্মদিন পেরিয়ে এসেও যদি প্রশ্নমালা অব্যাহত থাকে, এতেই প্রমাণিত, পুনরাবিষ্কারের অবকাশ রয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে নবায়মান জিজ্ঞাসাও মীমাংসা প্রয়াসের সূত্রে সংযোগের নির্মাণই তো জীবন। সুতরাং শরৎচন্দ্র রয়েছেন জীবনের স্রোতধারায়, রয়েছেন অস্তিত্বের নান্দনিক ও সামাজিকমহতায়। মীমাংসা এক অসমাপ্ত প্রকল্প- এই প্রত্যয়ে সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের জন্যে নিরন্তর নিজেদের যোগ্যতা যাচাই করাই আমাদের করণীয়। প্রতীচ্যের যেসব প্রথিতযশা কথাকারদের উল্লেখ প্রতিবেদনে করেছি, শরৎচন্দ্র তাঁদের কারোর মতোই লেখেননি, লেখার কথাও নয়। তেমনই বাংলা কথাসাহিত্যের চিরবরণীয় রবীন্দ্রনাথ কিংবা বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর–মানিক-জগদীশ-সতীনাথ; কারও সঙ্গেই তাঁর প্রতিতুলনা অবান্তর। শরৎচন্দ্র অর্জনে এবং অনর্জনে অনন্য এবং অদ্বিতীয়। তাঁর প্রকল্প, তাঁর বাচন, তাঁর উপস্থাপনা শুধুমাত্র তাঁরই। এই সামর্থ্যেই তিনি প্রতিবেদনের একান্ত নিয়ন্তা। প্রখ্যাত তত্ত্বগুরু জাক্‌ লাকাঁ একদা লিখেছিলেন, ‘It is the world of words which creates the world of things’ ( ১৯৭৭: ৬৫) যথার্থ এই উচ্চারণ। শব্দের জগৎ থেকে বস্তুজগৎ জন্ম নেয়। আবার ইতিমধ্যে লিখেছি, বস্তুবিশ্বই চিহ্নবিশ্ব। সুতরাং শরৎচন্দ্রের আখ্যানবিশ্বও মূলত চিহ্নবিশ্ব। তবে চিহ্নায়িত এই ভুবন আদ্যন্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক। এদের নিষ্কর্ষ গ্রহীতা পাঠকের কাছে তখনই পৌঁছায় যখন সময় ও পরিসরের অদৃশ্য আততিতে খচিত বাচনের সঙ্গে সার্বিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বহুধা রূপান্তরিত একুশ শতকের নবীন পাঠকের পক্ষেও নান্দনিক উপলব্ধির এই প্রাক্‌শর্ত অনিবার্য। সার্বিক বিচারে শরৎচন্দ্রের পাঠকৃতিতে নিহিত মানবিক অন্তঃসারের সঙ্গে যতদিন আমাদের দ্বিরালাপ কোনো-না-কোনোভাবে অটুট থাকবে এবং পাঠকৃতির বহুস্বর ও অনেকার্থদ্যোতনা সম্বন্ধে আমাদের আগ্রহ অম্লান থাকবে— অন্তত ততদিন তিনি পড়ুয়াদের কাছে যাদু শৃঙ্গার হয়েই থাকবেন। যতই উপুড় করি না কেন, তৃষ্ণাহর জল অফুরান রয়ে যাবে। তৃষ্ণার ধরণ পালটে যেতে পারে, কিন্তু ভৃঙ্গার হয়ে উঠবে অক্ষয় তূণীর। হ্যাঁ, দ্বিধা আছে, দোলাচল আছে, পিছুটান আছে, স্ববিরোধিতা আছে, সংস্কারমুগ্ধতা আছে তাঁর। তবু অতিক্রমণের খোঁজও আছে। এবং, বহুধা-তাড়িত সাম্প্রতিক বাঙালি সমাজে এইটেই আশ্বাসের সংকেত নিরাময়ের আঁকড়ে ধরার মতো একটুকু বিশল্যকরণী।

70 বার দেখা 0 বার শেয়ার

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

লেখক: তপোধীর ভট্টাচার্য
লেখকের পাতা দেখুন

সম্পর্কিত লেখা