অণুগল্প

রঞ্জন মারা গেছে

রঞ্জন মারা গেছে
কাজল সেন খণ্ড 1 · সংখ্যা 2 · OCTOBER · 2025 · 6 বার দেখা

রঞ্জন আচার্য বিছানায় শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগেও বসেছিল। কিন্তু এখন আর বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। একটু আগেই সে মারা গেছে। বস্তুত রঞ্জনকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না। সবকিছু ব্যবস্থা বন্দোবস্ত করে সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যেতে অনেক দেরি। বিশেষত দুই ছেলে কাছে নেই, তারা কর্মসূত্রে সপরিবারে হায়দ্রাবাদে আর ব্যাঙ্গালোরে থাকে। দুজনকেই খবরটা দেওয়া হয়েছে। দুই ছেলেই জানিয়েছে, তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্লাইট ধরে দমদমে পৌঁছোচ্ছে। ছেলেরা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। সন্ধ্যের আগে মনে হচ্ছে শ্মশানে যাওয়া সম্ভব হবে না। তবে রঞ্জনের একমাত্র মেয়ে বিয়ে করে স্বামীর ঘর করতে গেছে নেদারল্যান্ডে। খবরটা তাকেও জানানো হয়েছে। মেয়েও আসার কথা জানিয়েছে, কিন্তু তার আসা পর্যন্ত রঞ্জনকে ঘরে ফেলে রাখা যাবে না। সেও ফ্লাইট ধরেই আসবে, তবে দূরত্বটা যেহেতু নেহাত কম নয়, তাই মেয়ের আসার জন্য অপেক্ষা করা হলে, রঞ্জনের শরীর পচতে শুরু করবে, আর সেই পচাগন্ধে কেউ টিকতে পারবে না, সবাই পালাবার পথ খুঁজবে।

এসব কথা রঞ্জনও উপলব্ধি করে। সে চায় না, তার জন্য কেউ বিব্রত হোক। তবে একথা তো ঠিক যে, দুই ছেলের প্রতি তার অপত্যস্নেহ যতটা তীব্র ছিল, তার থেকে বেশি তীব্র ছিল মেয়ের জন্য! বিয়ের আগে যতদিন কাছে ছিল, তাকে আঁকড়েই তিনি বেঁচেছিলেন। দুই ছেলে তার আগে সেই যে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য চেন্নাই চলে গেল, তারপর তো তারা আর বাবার কাছে এসে থাকতে পারেনি! পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করল। কাজ কাজ, কাজের চাপে চিড়ে চ্যাপটা হয়ে গেল। বছরে হাতেগোনা ছুটি। সেই ছুটি নিয়ে যখন বাবার কাছে আসে, তখন আর ক’দিনই বা থাকতে পারে! তাদের আসা-যাওয়া নিতান্তই যেন অতিথির মতো। বিয়ের পর সেই ছুটিতে ভাগ বসালো ছেলেদের শ্বশুরবাড়ি। তবে মেয়ে অনেকটা ছোট ছিল, তাই অনেকদিন রঞ্জনের কাছেই ছিল। নতুবা রঞ্জন তো নেহাতই একা মানুষ! গিন্নি যে তাকে অহেতুক পথে বসিয়ে আগেভাগেই যাত্রা করবে, তা তো আর আন্দাজ করা যায়নি!

শুয়ে শুয়ে মনটা খুব বিষণ্ণ হয়ে গেল, আজ যদি গিন্নি পাশে থাকত! তা গিন্নিকে কাছে পাওয়া না গেলেও শেষ যাত্রায় দুই ছেলে তার পাশেই থাকবে। মেয়েটা অবশ্য থাকতে পারবে না। আসছে সেই কতদূর থেকে! যখন এসে পৌঁছবে, তখন রঞ্জন আর থাকবে না।

হঠাৎ একটা ভাবনা মনে বুড়বুড়ি কাটতে শুরু করল। তাই তো! হায়দ্রাবাদ ও ব্যাঙ্গালোর থেকে দুই ছেলে আর নেদারল্যান্ড থেকে মেয়ে আসছে কেন? এসে তারা কী করবে? তাদের মা বেঁচে থাকলে মা’কে নাহয় সান্ত্বনা দিত, কিন্তু বাবার জন্য কীইবা করার আছে? ছেলেরা তো এসে দেখবে বাবার মরামুখ, মেয়ে সেই মুখও দেখার সুযোগ পাবে না! তাহলে! মরা পোড়াবার জন্য ছেলেদের কী প্রয়োজন? কাজটা যে কেউ করতে পারে! আর শ্রাদ্ধশান্তি! তাতে রঞ্জনের কী যায়-আসে?

6 বার দেখা 0 বার শেয়ার

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

লেখক: কাজল সেন
লেখকের পাতা দেখুন

সম্পর্কিত লেখা