ছোটগল্প

মেটামরফোসিস

মেটামরফোসিস
ওয়াহিদার হোসেন খণ্ড 2 · সংখ্যা 1 · JULY · 2026 · 37 বার দেখা

গন্ধটা সহ্য হচ্ছিলনা। শরীরের এত বাজে দুর্গন্ধ তমালের সহ্য হয়না। অথবা এই গন্ধটি বাইরে কোথাও থেকে উড়ে এসেছে। এসে জড়িয়ে গেছে তোয়ালের মতো। তোয়ালের কথায় মনে পড়লো এখন যদি স্নান করা যায় গন্ধটা পালাবে কি?এই গন্ধটা খুব পরিচিত। পরিচিত হলেও বিশ্রী। বৃষ্টিতে দীর্ঘদিন ভিজলে কুকুরের গা থেকে যে গন্ধ বের হয় ঠিক সেই গন্ধটা। শাওয়ার চালিয়ে দিয়ে লিরিল মাখে তমাল। গরমের দিনে দু তিনবার স্নান না করলে হয়না। স্নান করলেও ঠান্ডা লাগার ভয় নেই। স্নান না করলে রাতে ভালো ঘুম হয়না। তবে এটা যে ঘামের গন্ধ নয় এটা নিশ্চিত। তাহলে কোথা থেকে এলো? পরপর দুদিন একই ঘটনা ঘটলো তমালের সঙ্গে। ব্যাঙ্ক থেকে আসার পরে কখন ক্লান্ত অবস্থায় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। স্টেট ব্যাঙ্কে প্রচুর চাপ থকে। গতকাল ছিলো শনিবার। মাসের সেকেন্ড উইক। তাই সারাদিন বাড়িতেই ছিলো। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে নেই। এবং আজ রবিবার আবারও ঘুম থেকে উঠে সেই একই গন্ধ। তমালের ছাব্বিশ বছরের জীবনে কখনো সে কুকুর পোষেনি। ছোটবেলায় যখন সে গ্রামে থাকতো তখন বাড়িতে একটা কুকুর ছিলো বটে। কিন্তু কৈশোরে সে কোন কুকুরের সংস্পর্শেও আসেনি। তাহলে এই গন্ধটা স্মৃতি থেকে নয়। এর উৎস তমালকে খুঁজে বের করতে হবে। স্নানের পরে তোয়ালে জড়িয়ে সে বাইরে এলো। এসে দেখছে তার চেহারা যেন এলসেশিয়ানের মতো দেখাচ্ছে। আয়নায় দেখেই সে চমকে উঠলো। মাথায় বজ্রাঘাতের মতো হচ্ছে। কেন। হঠাৎ ওর চেহারা কুকুরের মতো মনে হচ্ছে? সত্যিই সে কি কুকুরের মতো হয়ে গেছে? ধপ করে সে বিছানায় বসে পড়ে। আবার ওঠে এবং আয়নায় তাকিয়ে দেখে না না সব ঠিক আছে। ওরই হয়তো দুদিন গন্ধটা নিয়ে বেশি ভাবতে গিয়ে এরকম হয়েছে।

সকালে মনে পড়েনি কোন স্বপ্ন সে দেখেছিল কিনা। বিছানা থেকে উঠে এজ ইউজুয়াল টয়লেট, স্নান খাওয়া দাওয়া করে টাই পরে সে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। এটা একটা ফ্ল্যাট। এপার্টমেন্টের নাম উজ্জয়িনী। প্রমোটারের সখ ছিলো ঘোরার। ইতিহাসের ছাত্র। তাই হয়তো এরকম নাম রেখেছে। ভদ্রলোক যথেষ্ট ভদ্র। তমালের সঙ্গে বেশি দরদাম করেনি। ব্যাঙ্ক সেই লোন দিয়েছিল। এখন প্রত্যেক মাসে ইএমআই কাটছে। তমাল লিফটে করে নেমে আসে। রাস্তায় নামে এবং একটা টোটোও পেয়ে যায়। চলতে চলতে একসময় হিলকার্ট রোড পেরিয়ে যায়। তখন তার মনে পড়ে সে অলরেডি ব্যাঙ্ক ছাড়িয়ে এসেছে। আরেকটা টোটো ধরে সে ব্যাঙ্কে পৌঁছায়। তারপর বেশিকিছুদিন স্বাভাবিক ভাবেই সবকিছু চলতে থাকে। একদিন আবার সে বিকেলে ঘুমোয় এবং দেখে তার ফ্ল্যাটে কোথা থেকে একটা কুকুর ঢুকে বসে আছে। তবে আজ গন্ধটা নেই। কুকুরটা ভীষণ ভয়ানক। তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঘুম ভাঙার পরে এরকম বিচিত্র ঘটনা দেখে তমাল আঁতকে ওঠে। তমালের মনে হয় সে স্বপ্ন দেখছে। অথচ কুকুরটি বসে আছে মেঝেতে। এমন সময় একটি নারী কন্ঠে সে রাগবি রাগবি শুনতে পায়। চোখ ভালো করে খুলে সে দেখে ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। একটি কুড়ি বাইশ বছরের তরুণী ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে কুকুরটিকে ডাকছে। কুকুরের গলায় বেল্ট। মেয়েটি তমালের দিকে তাকিয়ে হেসে ফ্যালে। তমাল একটা হাফপ্যান্ট পরে শুয়েছিল। খালি গায়ে। ফ্যান তুমুল চলছে। মেয়েটি তমালের দিকে

তাকিয়ে বলে
সরি,
না ঠিক আছে। তমাল বলে।
আমি আসতে পারি?
আসুন। বলে তমাল স্যান্ডোগেঞ্জিটা পরে নেয়। সোফা ঝাড়তে থাকে। মেয়েটিকে সোফা দেখিয়ে দেয়। মেয়েটি ঘরে ঢোকে।

আসলে আপনার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিলো। তাই ভুল করে হয়তো রাগবি ঢুকে পড়েছে। আসলে অপরিচিত মানুষ দেখলে ও ঘাবড়ে যায়। আমি পাশের ফ্ল্যাটে কদিন বেড়াতে এসেছি। চক্রবর্তী বাবু আমার কাকু হন।
ও আচ্ছা। হরেনদা আপনার কাকু?
হ্যাঁ।
বসুন না।
আসলে আমি ওকে নিতে এলাম। আমি আর আমার পরিবার জলপাইগুড়ি থেকে এসেছি। একটু পরেই বেরিয়ে যাবো। কিছু মনে করবেননা। আসি।
মেয়েটি কুকুরটিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। তমাল হাফ ছেড়ে বাঁচে। এই কুকুর বিভ্রাট থেকে সে নিষ্কৃতি চায়। যদিও মেয়েটি ভীষণ সুন্দর তবু ওর সঙ্গের শ্বাপদটির জন্য তমালের বিরক্তি আসে। তমাল দরজা বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকায়। না কোনো এঙ্গেল থেকেই তাকে কুকুরের মতো লাগছেনা।

মার্চ মাস। তমালের স্বপ্নে প্রায়ই এখন একটি কালো রঙের কুকুর আসছে। এবং ঘুম ভাঙার পরে তার গায়ে লেগে আছে কুকুরের গন্ধ। সোঁদা একটি গন্ধ যা হাজারবার ওয়াইল্ড স্টোন স্প্রে করলেও যাচ্ছেনা। ইদানীং রুমে থাকাও যাচ্ছেনা কোনোভাবে। কুকুরের বিকট গন্ধ।

তমাল ঠিক করে বাড়ি ফিরবে। দোলের ছুটিতে সে বাড়ি ফেরে। দুদিন টানা বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কাটায়। সে তার মনের কথা কাউকে বলতে পারেনা। মা বাবা বোন কারো সঙ্গেই সে ব্যাপারটা শেয়ার করতে পারেনা। অথচ এখনো প্রত্যেক রাতে কালো রঙের একটা কুকুর তার স্বপ্নে আসছে। কেন আসছে সে জানেনা। তার শরীর থেকে কুকুরের গন্ধ বেরিয়ে আসছে। সে বুঝে উঠতেই পারছেনা কি করবে। এবার সে নিশ্চয়ই ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবে। এটা মনের অসুখ সেটা নিয়ে আর দ্বিমত হওয়ার কিছু নেই।

খাবার আগে বাবা জিগ্যেস করলো
শুকিয়ে যাচ্ছিস কেন?
এমনি। কিছু হয়নি। ব্যাঙ্কের চাপতো।
অন্য ব্যাপার থাকলে বলতে পারিস।
না না অন্য কি হবে।
শোন তোর মা তোর জন্য মেয়ে দেখছে। তোর পছন্দের কেউ থাকলে বল।

না বাবা। আমার কোনো কাহিনি নেই। বলে তমাল ফ্যাকাসে হাসে। তবে আমাকে একটু সময় দাও। অন্তত ছ'মাস কি
বছর খানেক। বলে তমাল বোনের দিকে আঁড়চোখে তাকায়।
আমার দিকে তাকিয়ে কি লাভ বল? বোন বলে।
কি লাভ মানে? তমাল জিগ্যেস করে।

আরে জলপাইগুড়ির একটা মেয়েকে মা দেখেছে বিয়ে বাড়িতে। তাতেই পছন্দ হয়ে গেছে। ওদেরও আপত্তি নেই।
মেয়েটার ছবি দেখবি?
দেখে কি করব?
আরে দাদা দ্যাখ না।
আচ্ছা নিয়ে আয়।
আসলে মেয়েটা ফেসবুকে আছে। ওখান থেকেই ছবিটা নিয়েছি। বোন বলে।
তমাল বলে বেশি কথা না বলে দেখা।
এই যে।

তমাল ছবিটা দেখে ভিরমি খায়। এই সেই মেয়েটা। হাতে শেকল। সঙ্গে একটি মস্ত কুকুর বেল্টে বাঁধা। তমাল তাকিয়ে থাকে।
বাবা হেসে বলে কেমন দেখলি?
সব ঠিক আছে। কিন্তু মেয়েটি কুকুরটাকে ধরে আছে। এটা বিরক্তিকর বাবা। আমার একদম কুকুর পছন্দ নয়। ও আচ্ছা। বাবা বলে। তা তুই কুকুর অপছন্দ করিস। তাইতো?কিন্তু একদিন একটা কুকুরই তোর প্রাণ
বাঁচিয়েছিল। মনে আছে?

তমাল অবাক হয়। ভীত হয়। চমকে ওঠে মানে?
তোর মা বলেনি?
নাইন্টিন নাইন্টি টুতে হাসিমারা আলিপুরদুয়ার মাদারীহাটে বিরাট বন্যা হয়েছিল। তোর অবশ্য মনে না থাকারই কথা।
তমাল একমনে শোনে।

তখন আমি মাদারীহাটে এক গ্রামে হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতাম। একদিন হঠাৎ করেই রাত্রে মুজনাই ইকতি আর তোর্ষায় বন্যা আসে। মাদারীহাটে তুমুল বন্য হয়। পাহাড় থেকে হুহু করে নেমে আসে বন্যা। হড়পা বানে ভেসে যায় বেশকিছু বাড়ি কোয়ার্টারে হুট করে জল ঢোকে। তোর মা তোকে রেখে গেছিল বাজারে। তখন সন্ধ্যা। ওইদিন আমি ছিলাম আলিপুরদুয়ারে আমাদের হাসপাতালের কাজেই যেতে হয়েছিল। হঠাৎ শুনি এদিকে বন্যা। বাকি গল্পটা তোর মা'র মুখে শোন।
মা ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে ঘরে এসেছে। তমাল মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে হ্যাঁ মা বন্যার গল্পটা বলো। মা বলে আমি যখন বাজারে তখনই বন্যা ঢোকে হুড়মুড় করে। ওইদিন রাতে আর কোয়ার্টারে ঢুকতে পারিনি। বিছানায় ছিলি তুই। ঘুমানো। আধ ঘন্টায় বন্যা ঢুকে পড়বে ভাবিনি। পরেরদিন ভোরে জল কিছুটা নামলে আট দশজন মিলে আমরা ঢুকি। তোর বাবা তখনও আলিপুরদুয়ারেই। রাস্তাঘাট সব শেষ। তখন কারো বাড়িতে মোবাইল দূর অস্ত ফোনও ছিলনা। যে খবর পাবো। এদিকে কোয়ার্টারে ঢুকে দেখি। তুই বিছানায় নেই। আমি তো তখনই অজ্ঞান। পরে চোখ খুলতে দেখি রান্নাঘরের স্ল্যাবে তোকে নিয়ে শুয়ে আছে আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করা কুকুর ভুলু। ভাগ্যিস সেদিন কুকুরটাকে ঘরের ভেতরে রেখেই বেরিয়েছিলাম। কুকুরটা তোকে জড়িয়ে নিয়ে ছিল। কাউকে কাছে আসতে দিচ্ছিলনা। মায়ের চোখে জল।

জানিস বাপন (তমালের ডাক নাম) ভুলুর শরীরের কালো রং ওর ভেজা শরীরের গন্ধ তখনও তোর গায়ে।

37 বার দেখা 0 বার শেয়ার

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

লেখক: ওয়াহিদার হোসেন
লেখকের পাতা দেখুন

সম্পর্কিত লেখা